তানভীর তোকেই বলছি……..
হ্যাঁ তানভীর তোকেই বলছি……..। তুই কেমন আছিস, কোথায় আছিস। আচ্ছা আমরা কি কোন দোষ করেছিলাম যার কারনে তুই আমাদের মাঝ থেকে সেই দিতীয় সেমিস্টারেই চলে গেলি । আচ্ছা তুই চলে যাবার পরেও আমরা কত মজা করলাম, ঘুরতে গেলাম তোর কি আমাদের সাথে মজা করতে ইচ্ছে হয় না। যদি ইচ্ছে হয় তাহলে তুই আমদের ছেড়ে কি করে দি্নের পর দিন কাটাচ্ছিস। আচ্ছা বল দেখি, তুই কি করে প্রায় ৬ ফুট মানুষ হয়েও মাত্র তিন হাত জায়গায় দিনের পর দিন কাটাচ্ছিস। তোর কি কস্ট হয় না, খুব জানতে ইচ্ছে করে। তানভীর দোস্ত তোর কি মনে পরে , তোকে দেখলেই আমি প্রথম যে কথাটা তোকে বলতাম তা হল,তানভীর তোকে দেখলে নিজেকে আরো খাটো মনে হয়। কারন লম্বার কাছে খাটোকে আরো খাটো বলে মনে হয়। মানুষ যে এত ভালো হয় তা তানভীরকে না দেখলে হয়ত বুঝতাম না। খেলার মাঝে আমার
বাম হাতের হাড় ভেঙ্গে গেল। আমি মাঠের একপাশে বসে কাতরাচ্ছি। বাকি সবাই খেলছে। কোথা থেকে তানভীর এসে শুনল আমার হাত ভেঙ্গেছে, সে তখনই আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডাক্তারের কাছে রওনা দিল। পরে অবশ্য আমাদের ডিপার্টমেন্টের আরও অনেকে এসেছিল ডাক্তারের কাছে।
প্রথম থেকেই কেন জানি নোয়াখালী আসার ব্যাপারে এক অজানা ভীতি কাজ করেছিল। আমার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া থানার রামশীল নামক একটি ছোট্ট গ্রামে । সত্যি কথা বলতে কি আমাদের অঞ্চলের মানুষ বিদেশে পড়াশুনা করে শুনলে যতটা না অবাক হয় তার চেয়ে বেশি অবাক হয় যদি শুনে নোয়াখালী পরাশুনা করে। নোয়াখালীতে পড়াশুনা করব এটা কখনই মনে হয়নি। কিন্তু ভাগ্যের পরিক্রমায় আজ আমি নোয়াখালীতে আমার অনার্স লাইফ শেষ করতে চলছি। আমার নোয়াখালীতে ভর্তি হওয়ার ঘটনাটাও বেশ অনাকাঙ্ক্ষিত। আমার গ্রামের বন্ধু আশিস অনেক আগে থেকেই ঠিক করেছে সে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিবে। আমরা দুজনে তখন ঢাকা একই মেসে থাকি। সে তখন অনেক খোঁজাখুঁজি করে Vertex গাইড টি সংগ্রহ করে। আমার সম্পূর্ণ মনে আছে তার, গাইডটি সংগ্রহ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। কিন্তু দুখের বিষয় ওর ইন্টারমিডিয়েটে অংক না থাকার কারনে ও পরীক্ষাই দিতে পারেনি আর ওর টাকায় কেনা
গাইড পড়ে আমি চান্স পেয়ে গেলাম আমার পছন্দের সাবজেক্টে।
নোয়াখালী আসার পর আমার সব ধারনা পাল্টে গেল। কোন এক জায়গা, বাইরে থেকে যে রকম মনে হয় আসলে সেই জায়গায় না গেলে তা প্রকৃত ভাবে বুঝা কখনই সম্ভব নয়। ভালো খারাপ সব জায়গায় আছে, হয়ত কোন এলাকায় একটু বেশি আর কোন এলাকায় একটু কম। নোয়াখালীও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে ভালো মানুষ যেমন আছে তেমনি খারাপ মানুষ ও আছে। আসলে বাঙ্গালিদের একটি স্বভাব আছে তা হল সে যখন যেই জায়গায় থাকবে সেই জায়গার বদনাম না করলে রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, বাঙ্গালিরা বাঙ্গালিদের ভালো কখনও দেখতে পারে না। এরা পরশ্রীকাতর। পরের শ্রী দেখে কাতর।
প্রথমে ল ইয়ার্স কলোনী, তারপর হাউজিং, তারপর আমাদের হলের ৩০৩ নাম্বার রুম হয়ে এখন ৪২৩ নাম্বার রুমে এসে ঠাই নিয়েছি। আসা করি নোয়াখালী ত্যাগ করার আগে আর স্থান পরিবর্তন নামক বস্তুটির সাথে সাক্ষাৎ করতে হবে না। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক কে পেয়েছি রুমমেট, ফ্ল্যাটমেট হিসেবে যার অধিকাংশই ষষ্ঠ ব্যাচের। নোয়াখালীতে আসার পর পেয়েছি অসম্ভব ভাল রকমের কিছু বন্ধু। পেয়েছি সি.এস.টি.ই ষষ্ঠ ব্যাচ নামক এক ব্যাচ যে ব্যাচ জানে দুঃখ কি জিনিস, সুখ কি, ভালোবাসা কি, সংস্কৃতি কি, একত্রতাই বা কি জিনিস। একথা সত্য যে আমাদের পুরো ষষ্ঠ ব্যাচেই একত্রতা আছে না হলে র্যাগ ডে এর মত এক বিশাল প্রোগ্রাম করা সম্ভব হত না। যারা এর উদ্যোগ নিয়েছে তাদেরকে মন থেকে ধন্যবাদ দেই। এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় অনেক কিছু দেখেছি, অনেক কিছু শিখেছি। দেখেছি কি করে একজন মানুষ, কে কি বলবে তার ভয়ে নিজের স্রোতের বীপরীতে গিয়ে শুধুমাত্র প্রথম দিকে আছে সেই জন্য বিধায় সেই সাবজেক্টে পড়ে পরিবেশের প্রতিকূলতার
সাথে পেরে উঠতে না পেরে মাঝখান থেকেই ছিটকে পড়তে হয়। শিখেছি একজন পরিপূর্ন মানুষ কিভাবে হতে হয়।
আগে আমরা ছিলাম ৪৮ জন। এখন ৪৬। তানভীর অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে অজানার উদ্দ্যেশে পাড়ি দিয়েছে। আর সুজন পাল (মনোজ) আমাদের ছেড়ে তার ভাললাগার স্থানে চলে গিয়েছে। তানভীর দোস্ত আমার ভাঙ্গা হাত আজ পর্যন্ত ঠিক হয় নি। যেভাবে হাড় জোড়া লাগার কথা তার উলটো ভাবে লেগেছে। কিন্তু কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়না। তাই ভাবি এভাবে থাক না যতদিন থাকে। কারন হাতের কথা মনে পড়লে তোর কথাও মনে পরে। জানি সময়ের পরিক্রমায় একদিন সবকিছু যাপসা হয়ে আসবে । তবে
তুই ছিলি, তুই আছোস, তুই থাকবি আমাদেরই হৃদয়ে সবসময়।
নোবিপ্রবিকে হয়ত কিছুই দিতে পারিনি, কিন্তু নোবিপ্রবি আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্তগুলি। শেষ দিকে এসে নোবিপ্রবির মায়ার জালে আরো আটকা পরে যাচ্ছি। দিন যত যাচ্ছে বাস্তবতার জালে ততই আটকা পরছি। তবে যেখানেই থাকি না কেন, মাঝে মাঝে আবার ফিরে আসব আমাদের এই প্রিয় ক্যাম্পাসে। দিগন্তজোড়া কাশফুলের সমারোহ দেখতে।
সুকান্ত বালা
সি.এস.টি.ই, ষষ্ঠ ব্যাচ।
No comments:
Post a Comment